মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও তীব্র বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হয়েছে চীনের। ২০২৫ সালে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প বাজারগুলোয় রফতানি বৃদ্ধি। গতকাল প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত নভেম্বরেই প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। খবর রয়টার্স।
রফতানি পণ্যের জন্য কেবল মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে কৌশল পরিবর্তন করেছেন চীনের নীতিনির্ধারকরা। তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারগুলোয় মনোযোগ বাড়িয়েছেন। এ বহুমুখীকরণ নীতি চীনের অর্থনীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাধা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। দেশটির কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের মোট বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
এইচএসবিসির এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেড নিউম্যান বলেন, ‘বিশ্ববাজারে চীনের পণ্য এখনো অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। এর মাধ্যমে যেমন চীনা নির্মাতাদের দক্ষতা ও উন্নত প্রযুক্তির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি দেশটির ভেতরের একটি সংকটের চিত্রও ফুটে ওঠে। আসলে চীনের নিজেদের বাজারে পণ্যের চাহিদা কম থাকায় কোম্পানিগুলো বাড়তি পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। চীনের এ বড় আকারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অন্যান্য দেশের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ নিজেরাও পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে, তারা চীনের সাশ্রয়ী পণ্যের চাপে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ওই দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
চীনের কাস্টমস প্রশাসনের ভাইস মিনিস্টার ওয়াং জুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাণিজ্যিক অংশীদারদের বহুমুখীকরণের ফলে চীনের বাণিজ্য ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
চীনের কাস্টমস প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে দেশটির রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। নভেম্বরে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করেছিলেন রফতানি মাত্র ৩ শতাংশ বাড়তে পারে, কিন্তু প্রকৃত ফলাফল সেই পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে চীনের আমদানিও বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝাং বলেন, ‘শক্তিশালী রফতানি প্রবৃদ্ধি চীনের অভ্যন্তরীণ দুর্বল চাহিদার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করছে।’
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রফতানি কমেছে ২০ শতাংশ। পাশাপাশি দেশটি থেকে আমদানিও কমেছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে একই সময়ে আফ্রিকায় চীনের রফতানি ২৫ দশমিক ৮ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নেও দেশটির রফতানি ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। চীনের বিরল খনিজ রফতানিও গত বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একে ওয়াশিংটনের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তবে ২০২৬ সালেও চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরান ইস্যুতে চীনের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং বলেন, ‘ট্রাম্পের এ হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।’